আরব বিশ্ব

তেল না থাকলে আরব বিশ্বে যা হবে

শুকিয়ে আসছে তেলকূপ। বাড়ছে চাহিদা। কোন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে চলেছি আমরা?

ভয় ধরানো আবিষ্কারটা হলো ২০০০ সালে। আবিষ্কারক তেল বিশেষজ্ঞ সাদাদ আল হুসেইনি। তিনি তখন সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বিভাগের প্রধান। তেল কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের উৎপাদন নিয়ে সব সময় যে বড় বড় কথা বলে আসছে, শুরু থেকেই অবশ্য তার বিরোধিতা করে আসছেন হুসেইনি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে ২৫০টির মতো তেলকূপের তথ্য নাড়াচাড়া করেছেন তিনি।

পৃথিবীর তেলের ক্ষুধার বেশিরভাগই মেটায় এই কূপগুলো। তেলকূপগুলোতে ক’গ্যালন তেল অবশিষ্ট আছে আর কত দ্রুত সেটুকুও কমছে তা হিসাব কষে দেখেছেন তিনি। হিসাব কষেছেন নতুন কূপ নিয়েও সামনের দিনগুলোতে যেগুলো অনেক তেল উগরাবে বলে বগল বাজাচ্ছে তেল কোম্পানিগুলো। হিসাব-টিসাব কষে হুসেইনির উপসংহার হলো তেল বিশেষজ্ঞরা হয় ভুল তথ্য নিয়ে মজে আছেন নইলে এটা সেটা দিয়ে একটা ধোঁয়াটে ধারণা দিচ্ছেন। পরিষ্কার করছেন না কিছুই।

অনেক বড় বড় ভবিষ্যৎবেত্তা বলছেন তেলের উৎপাদন প্রতি বছরই বেশ ভালোই বাড়ছে। চাহিদার সাথে বেশ মানানসই। কিন্তু হুসেইনির হিসাব-নিকাশ বলছে ভিন্ন কথা। উৎপাদন রেখা এখন সমান, ঊর্ধ্বমুখী নয়। এ অবস্থাও অনাদিকাল থাকবে না। বছর ১৫ পর ধীরে ধীরে নামতে শুরু করবে এই রেখা। এই পতন ঠেকানো অসম্ভব।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের রিজার্ভ যেখানে সেই সৌদি আরামকোর কাছে এমন কথা কেউ আশা করেনি। সোজা হিসাবে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যে তেল পাওয়া গেছে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ জমানো সৌদি আরামকোতে। পরিমাণে প্রায় ২৬০ বিলিয়ন ব্যারেল। বলা হতো আরো বহু বছর সমানে তেল উঠালেও এই রিজার্ভের তেমন গায়ে লাগবে না। কিছু বাণিজ্যিক সূত্রে অবশ্য জানা গেছে সৌদি তেলমন্ত্রী হুসেইনের এই রিপোর্টকে তেমন গুরুত্ব দেননি। পরে হুসেইনি আরামকো থেকে অবসরও নিয়েছেন। এখন তিনি একজন ইন্ডাস্ট্রি কন্সালটেন্ট। কিন্তু হুসেইনির কথা যদি সত্য হয়, তাহলে সস্তা তেলে চলমান এই পৃথিবীর জটিল ব্যবস্থা, প্রতিরা, যোগাযোগ থেকে খাদ্য উৎপাদনসব কিছুর জন্যই নাটকীয় কিছু অপো করছে। খুব বেশি সময় সে জন্য হাতে নেই।

তেল নিয়ে এ রকম ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্য হুসেইন একাই করেননি। বহু বছর ধরেই তেল বিষারদরা বলে আসছেন পৃথিবীর পুরো রিজার্ভের অর্ধেক খালি হয়ে গেলে মাটির তলা থেকে তেল উত্তোলন খুবই কঠিন হয়ে যাবে। এক সময় ব্যাপারটা রীতিমতো অসম্ভবও হয়ে পড়বে বৈকি। বৈশ্বিক তেলের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন প্রতিদিনই বাড়ছে। ১৯০০ সালে যেখানে উৎপাদন হতো এক মিলিয়ন ব্যারেলের সামান্য কিছু বেশি, সেখানে এখন উৎপাদন হচ্ছে ৮৫ মিলিয়ন ব্যারল। এই বাড়তি উৎপাদন এক দিন থমকে দাঁড়াতে বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলো যেভাবে সংরতি তেল রিজার্ভগুলোর দিকে হাত বাড়াচ্ছে তাতে আমরা প্রস্তুত থাকি বা না থাকি একটা তেলশূন্য ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপো করছে। হতে পারে সেটা বিপর্যস্ত অর্থনীতির সময়, হতে পারে সেটা ভয়াবহ যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়।

তেল রিজার্ভ নিয়ে আশাবাদীদের কথাবার্তায় খুব বেশি যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। ব্যাপার এমন না যে কেউ দাবি করছে তেলের রিজার্ভ কখনোই শেষ হবে না। সমস্যাটা বরং ভিন্ন। আসলে কারোরই পরিষ্কার ধারণা নেই মাটির নিচে কী পরিমাণ তেল আছে আর কবে নাগাদ সেটা অর্ধেকে নেমে আসবে। যাদের হতাশাবাদী বলা হচ্ছে তারা বলছেন সেই সময়টা আসলে চলে এসেছে। প্রমাণ হিসেবে প্রতিদিনের উৎপাদন ওঠানামার কথা বলছেন হুসেইনি। হুসেইনির কথা সত্য বলে মানলে বোঝা যাবে কেন তেলের দাম এমন হু হু করে বাড়ছে। আর কেনই বা বছরের শুরুতে প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলারে ঠেকেছিল।

আশাবাদীরা অবশ্য হাল ছাড়তে চাইছেন না। তারা বলছেন, বহু বছর সময় আছে এখনো। অনেক তেল এখনো তোলা হয়নি। অনেক তেলখনি এমনকি আবিষ্কারও হয়নি এখনো। একটু ভিন্ন রকম তেলের রিজার্ভও আছে বেশ। পশ্চিম কানাডায় যেমন টার-স্যান্ডের (আলকাতরা মিশ্রিত বালি) বিশাল রিজার্ভ পাওয়া গেছে। অতীতের কথাও বলছেন আশাবাদীরা। অতীতে যখনই সঙ্কটের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে দেখা গেছে হয় নতুন খনির আবিষ্কার অথবা প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ভেতর দিয়ে সেটা পুষিয়ে নেয়া গেছে। হুসেইনির কথাকেও তাই গুরুত্ব দিচ্ছেন না অনেকে। ২০০৪ সালে যখন এই আশঙ্কার কথা শোনালেন তিনি, বিরোধীরা বললেন এ তো কিছু ‘কৌতূহলি পাদটীকা’ মাত্র। শিল্প-মালিকদের দাবি তেলের বর্তমান মূল্য বৃদ্ধিটা সাময়িক। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, এশিয়ায় হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়া আর ডলারের দর পতনের জন্য এটা হয়েছে।

ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের প্রধান অর্থনীতিবিদ এক সভায় বলেছিলেন তেলের রিজার্ভ শেষ হওয়ার আগেই মানুষের চাহিদা শেষ হয়ে যাবে। অন্য আশাবাদীদের অবশ্য এতটা নিশ্চিত মনে হয়নি।

Comments

comments